,

বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি

হুমকিতে ‘শহর রক্ষা বাঁধ’

সতর্কতায় প্রশাসনের মাইকিং

স্টাফ রিপোর্টার : হবিগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। জেলার ৪ উপজেলায় ৩৪টি ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। খোয়াই নদীর পানি সীমান্ত সংলগ্ন বাল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪৭ সেন্টিমিটার ও হবিগঞ্জ সদরে মাছুলিয়া পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। যেকোনো সময় শহর রক্ষা বাধ ভেঙ্গে যেতে পারে এ আশংকায় শহরবাসীকে সর্তক থাকার জন্য মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। এদিকে রাত ৯টার দিকে সদর উপজেলার গোপালপুরে বাঁধ ভেঙ্গে যায়। এতে আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানিও বেড়ে যাওযায় নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নবীগঞ্জ উপজেলার ৯টি, লাখাই উপজেলায় ৪টি, বানিয়াচং উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন এবং আজমিরিগঞ্জ পৌর এলাকাসহ ৫টি ইউনিয়ন এখন বন্যার কবলে। এর আগে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকড়া নামকস্থানে খোয়াই নদীর বাধ ভেঙ্গে পানি হবিগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে।


এদিকে তথ্য অফিসের মাইকিংয়ে বলা হয়, খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১২৭ সেন্টিমিটার এবং শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে পাঁচ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শহর রক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে। তাই যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ৪৫ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় বলে জানায় জেলা পাউবো। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জের মোস্তফাপুর আনোয়ারুল দাখিল মাদ্রাসার বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রটিও। গতকাল সোমবার হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের বিভিন্ন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেন। হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলার মধ্যে ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলা। এ চার উপজেলার উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে গেছে কুশিয়ারা নদী। এ ৪টি উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর অংশগুলো বেড়ামোহনা, কালনী ও ধলেশ্বরী নদী হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। কুশিয়ারা নদী সিলেটের শেরপুর (তিন জেলার মিলনকেন্দ্র) থেকে হবিগঞ্জের এ চার উপজেলা ঘেঁষে মেঘনায় গিয়ে মিশেছে। কুশিয়ারা নদীর হবিগঞ্জ অংশের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই চার উপজেলার প্রায় ৩২টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জের খোয়াই নদের জয়নগর এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে শনিবার থেকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন ও লাখাই উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া গুংঘিয়াজুড়ি হাওরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার অপর ভাটি উপজেলা বাহুবলের দুটি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। জেলার বন্যাকবলিত ৬টি উপজেলার মধ্যে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলার পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে।
বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ এ প্রতিনিধিকে জানান, তাঁর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টি ইউনিয়নই পুরোপুরিভাবে বন্যাকবলিত। সদর উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন আংশিক প্লাবিত হয়েছে। তিনি জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁরা ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছেন। তার মধ্যে গতকাল এক দিনেই ৮৬৮টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অনেক এলাকা থেকে লোকজনকে উদ্ধার করে এনে আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা করে দিচ্ছেন তাঁরা।
নবীগঞ্জের ইউএনও শেখ মহি উদ্দিন জানান, গতকাল ভোরে তাঁর উপজেলার কুশিয়ারা নদীর বাল্লা-জগন্নাথপুর এলাকায় বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবেশ করে নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এক দিনে প্রায় এক ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়ে তাঁর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার কিছু এলাকা এখন প্লাবিত। জেলা প্রশাসক খবর পেয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
আজমিরীগঞ্জের ইউএনও সুলতানা সালেহা সুমী জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আজ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাঁর পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন পুরোপুরিভাবে প্লাবিত এবং আজমিরীগঞ্জ পৌর এলাকাও বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসন থেকে তাদের খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাহুবল, হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলা প্রশাসন তাঁদের এলাকায় পানি বৃদ্ধি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন।
গতকাল সোমবার লাখাই উপজেলার বিভিন ্নস্থান ঘুরে দেখা গেছে, বাড়িঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় লোকজন তাদের জানমাল নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে ছুটছেন। গত ১ সপ্তাহ ধরে লাখাই ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত। অনেকের কাঁচাঘর বাড়ি পানিতে ভেসে গেছে। অনেকেই খোরাকির ধান পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বাজারে যেখানে ৯শ থেকে ১ হাজার টাকা দরে ধান বিক্রি হচ্ছে, সেখানে বন্যা কবলিত এলাকার কৃষকরা ৬/৭শ টাকা দরে গোলার ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ, বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলায় পরিস্থিতি কিছুটা আশঙ্কাজনক। এসব এলাকায় পানি বাড়ছে। তাঁরা জরুরি সেবা প্রদানে সব উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা পাঠিয়েছেন।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (অতিরক্তি) মিনহাজ আহমেদ শোভন বলেন, “পানি প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বৃষ্টি না হলেও রাত পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি ঘন্টায় পানি ১০ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শহর রাক্ষ বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে।” “আমরা সেটি সার্বণিক মনিটরিং করছি এবং বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। তবে পানি বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাঁধ উপচে শহরে পানি প্রবেশ করার আশঙ্কা রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য শহরবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। এদিকে, খোয়াই নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার বেশ কিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছেন।
হবিগঞ্জ শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন সদর-লাখাই আসনের এমপি এডভোকেট মো. আবু জাহির, পুলিশ সুপার এসএম মুরাদ আলি ও মেয়র আতাউর রহমান সেলিমসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।

     এই বিভাগের আরো খবর